সীতারাম জিন্দাল ফাউন্ডেশন স্কলারশিপ ২০২৬: প্রতিমাসে ৩২০০ টাকা পর্যন্ত, আবেদন পদ্ধতি ও যোগ্যতা

Sitaram Jindal Scholarship 2026

উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান খরচ অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য এক বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এই সমস্যা সমাধানের জন্যই সীতারাম জিন্দাল ফাউন্ডেশন প্রতি বছর ‘সীতারাম জিন্দাল স্কলারশিপ’ প্রকল্পের আয়োজন করে। একাদশ শ্রেণি থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর এবং পেশাদার কোর্স পর্যন্ত পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এই স্কলারশিপের জন্য আবেদন করতে পারেন, যা তাদের মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এই স্কলারশিপটি ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় বেসরকারি বৃত্তি প্রকল্প, যা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। এই ফাউন্ডেশনটি ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং এর মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা।

স্কলারশিপ কী ও কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

সীতারাম জিন্দাল ফাউন্ডেশন স্কলারশিপ ২০২৬ একটি মেধা ও আয়-ভিত্তিক বৃত্তি প্রকল্প। এই স্কলারশিপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষার খরচ যেমন—টিউশন ফি, বইপত্র, আবাসন খরচ ইত্যাদি মেটাতে সাহায্য পায়। এই স্কলারশিপের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এটি বছরের যে কোনো সময় আবেদন করা যায়। কোনো নির্দিষ্ট শেষ তারিখ নেই, যা শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক। এছাড়া, অনলাইন ও অফলাইন—উভয় পদ্ধতিতেই আবেদনের সুযোগ রয়েছে। এই স্কলারশিপটি ভারতীয় নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত, এবং বিভিন্ন রাজ্যের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা যোগ্যতার শর্ত রয়েছে।

Sitaram Jindal Scholarship 2026

কারা আবেদন করতে পারবেন? যোগ্যতার শর্তাবলী

সীতারাম জিন্দাল স্কলারশিপের জন্য আবেদনের যোগ্যতা নির্ধারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। আবেদনের আগে এই শর্তগুলি ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

শিক্ষাগত যোগ্যতা

  • একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি: যারা বর্তমানে একাদশ বা দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন।

  • আইটিআই (ITI): সরকারি বা বেসরকারি আইটিআই-তে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা।

  • স্নাতক স্তর: বিএ, বিএসসি, বিকম, বিবিএ, বিসিএ, বিএড, বিফার্ম সহ যেকোনো স্নাতক কোর্স।

  • স্নাতকোত্তর স্তর: এমএ, এমএসসি, এমবিএ, এমসিএ, এমফিল সহ যেকোনো স্নাতকোত্তর কোর্স।

  • ডিপ্লোমা কোর্স: ইঞ্জিনিয়ারিং, নার্সিং, ফার্মেসি, ফিজিওথেরাপি সহ বিভিন্ন ডিপ্লোমা কোর্স।

  • পেশাদার কোর্স: ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিন, স্থাপত্য (আর্কিটেকচার) ইত্যাদি।

  • শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা এই স্কলারশিপের জন্য আবেদনের যোগ্য নন

ন্যূনতম নম্বরের শর্ত

বিভিন্ন স্তরের জন্য ন্যূনতম নম্বরের শর্ত আলাদা:

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি: ছেলেদের জন্য ৭০% এবং মেয়েদের জন্য ৬৫%। তবে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য ছেলেদের ৭৫% এবং মেয়েদের ৭০%।

স্নাতক (সাধারণ): ছেলেদের জন্য ৬৫% এবং মেয়েদের জন্য ৬০%। পশ্চিমবঙ্গের জন্যও একই শর্ত প্রযোজ্য।

স্নাতকোত্তর (সাধারণ): ছেলেদের জন্য ৬০% এবং মেয়েদের জন্য ৫৫%।

ইঞ্জিনিয়ারিং/মেডিকেল: ছেলেদের জন্য ৭০% এবং মেয়েদের জন্য ৬৫%।

আইটিআই: ছেলেদের জন্য ৫০% এবং মেয়েদের জন্য ৪০%।

ডিপ্লোমা: ছেলেদের জন্য ৬০% এবং মেয়েদের জন্য ৫৫%।

বিশেষ ছাড়: শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, বিধবা এবং প্রাক্তন সেনা কর্মীদের অবিবাহিত সন্তানদের জন্য শুধুমাত্র পাস মার্কস প্রয়োজন।

পারিবারিক আয়ের সীমা

  • চাকরিজীবী পরিবারের জন্য: বার্ষিক আয় ₹৪,০০,০০০-এর কম হতে হবে।

  • অন্যান্য পরিবারের জন্য: বার্ষিক আয় ₹২,৫০,০০০-এর কম হতে হবে।

বয়সসীমা

আবেদনকারীর বয়স ৩০ বছরের কম হতে হবে।

অন্যান্য শর্ত

  • আবেদনকারীকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে।

  • আবেদনকারী অন্য কোনো স্কলারশিপ পাচ্ছেন না—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

  • আবেদনকারী পূর্ণকালীন ছাত্র হতে হবে; দূরশিক্ষণ বা খণ্ডকালীন কোর্সের শিক্ষার্থীরা আবেদনের যোগ্য নন।

কত টাকা পাওয়া যায়? বৃত্তির পরিমাণ

সীতারাম জিন্দাল স্কলারশিপের আওতায় শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাগত স্তর ও লিঙ্গ অনুযায়ী মাসিক আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন:

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি: ছেলেদের মাসিক ₹৫০০ এবং মেয়েদের ₹৭০০।
আইটিআই (সরকারি): ছেলেদের মাসিক ₹৫০০ এবং মেয়েদের ₹৫০০।
আইটিআই (বেসরকারি): ছেলেদের মাসিক ₹৭০০ এবং মেয়েদের ₹৭০০।
স্নাতক (সাধারণ): ছেলেদের মাসিক ₹১,১০০ এবং মেয়েদের ₹১,৪০০।
স্নাতকোত্তর (সাধারণ): ছেলেদের মাসিক ₹১,৫০০ এবং মেয়েদের ₹১,৮০০।
ডিপ্লোমা: ছেলেদের মাসিক ₹১,০০০ এবং মেয়েদের ₹১,২০০।
ইঞ্জিনিয়ারিং/মেডিকেল (স্নাতক): ছেলেদের মাসিক ₹২,০০০ এবং মেয়েদের ₹২,৩০০।
ইঞ্জিনিয়ারিং/মেডিকেল (স্নাতকোত্তর): ছেলেদের মাসিক ₹২,৮০০ এবং মেয়েদের ₹৩,২০০।

হোস্টেল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা: আইটিআই ও ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ₹১২০০ পাবেন; স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পেশাদার কোর্সের শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ₹১৮০০ পাবেন।

আবেদন পদ্ধতি: কীভাবে আবেদন করবেন?

সীতারাম জিন্দাল স্কলারশিপের আবেদন অনলাইন ও অফলাইন—উভয় পদ্ধতিতেই করা যায়।

অনলাইন আবেদন পদ্ধতি

প্রথম ধাপ: ফাউন্ডেশনের অফিসিয়াল পোর্টালে প্রবেশ করুন এবং ‘Apply Online’ অপশনে ক্লিক করুন।

দ্বিতীয় ধাপ: নিবন্ধন (Registration) সম্পন্ন করুন—একটি বৈধ মোবাইল নম্বর ও ইমেল আইডি দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।

তৃতীয় ধাপ: আবেদন ফর্ম পূরণ করুন—ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রতিষ্ঠানের বিবরণ এবং পরিবারের আয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান করুন।

চতুর্থ ধাপ: প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করুন (নিচে উল্লেখিত)।

পঞ্চম ধাপ: সমস্ত তথ্য যাচাই করে ফর্ম জমা দিন।

অফলাইন আবেদন পদ্ধতি

প্রথম ধাপ: অফিসিয়াল পোর্টাল থেকে আবেদন ফর্ম ডাউনলোড করে প্রিন্ট আউট নিন।

দ্বিতীয় ধাপ: ফর্মটি সঠিকভাবে পূরণ করুন এবং প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করুন।

তৃতীয় ধাপ: সম্পূর্ণ আবেদনপত্র নিম্নলিখিত ঠিকানায় স্পিড পোস্ট বা কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিন:

ঠিকানা: The Trustee, Sitaram Jindal Foundation, Jindal Nagar, Tumkur Road, Bengaluru – 560073

উত্তর ও পূর্ব ভারতের শিক্ষার্থীদের জন্য: Sitaram Jindal Foundation, Naturalle, No. 11, Green Avenue, Behind Sector D 111, Bhatta Road, Vasant Kunj, New Delhi – 110070

প্রয়োজনীয় নথিপত্র

আবেদনের সময় নিম্নলিখিত নথিগুলি প্রস্তুত রাখতে হবে:

  • শেষ পরীক্ষার মার্কশিট

  • দশম শ্রেণির মার্কশিট

  • পরিবারের বার্ষিক আয়ের শংসাপত্র

  • বয়সের প্রমাণ (জন্ম শংসাপত্র)

  • বর্তমান কোর্সে ভর্তির প্রমাণপত্র (ভর্তি সনদ/আইডি কার্ড)

  • ফি সংক্রান্ত রসিদ

  • ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ (পাসবুকের প্রথম পৃষ্ঠা)

  • পাসপোর্ট সাইজের ছবি

  • হোস্টেল সার্টিফিকেট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)

  • আধার কার্ড বা পরিচয়পত্র

আবেদনের সময়সীমা

সীতারাম জিন্দাল স্কলারশিপের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আবেদনের শেষ তারিখ নেই। শিক্ষার্থীরা বছরের যে কোনো সময় আবেদন করতে পারেন। তবে শিক্ষাবর্ষ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই আবেদন করাই উত্তম, যাতে স্কলারশিপের টাকা সময়মতো পাওয়া যায়।

নির্বাচন প্রক্রিয়া

স্কলারশিপের নির্বাচন প্রক্রিয়া নিম্নলিখিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়:

প্রথমে পূর্ববর্তী পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে একাডেমিক পারফরম্যান্স যাচাই করা হয়। তারপর পরিবারের আয়ের শংসাপত্র যাচাই করা হয়। এরপর প্রদত্ত সকল তথ্য ও নথি যাচাই করা হয়। প্রয়োজনে কিছু প্রার্থীদের ফোনে ইন্টারভিউ নেওয়া হতে পারে। সবশেষে ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

আবেদনের সময় সঠিক ও সম্পূর্ণ তথ্য প্রদান করুন। মিথ্যা তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে। সমস্ত নথি পরিষ্কার স্ক্যান করে আপলোড করুন। শুধুমাত্র অফিসিয়াল পোর্টাল থেকে আবেদন করুন। কোনো অনানুষ্ঠানিক এজেন্ট বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে আবেদন করবেন না। অন্য কোনো স্কলারশিপ পেলে আবেদন করবেন না। শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা আবেদনের যোগ্য নন।

শেষ কথা: সীতারাম জিন্দাল ফাউন্ডেশন স্কলারশিপ ২০২৬ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একাদশ-দ্বাদশ থেকে শুরু করে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পেশাদার কোর্স—বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীরা এই বৃত্তির আওতায় আসতে পারেন। মাসিক ৫০০ থেকে ৩,২০০ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা এই স্কলারশিপকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বছরের যে কোনো সময় আবেদনের সুবিধা থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিয়ে আবেদন করতে পারেন। যোগ্য শিক্ষার্থীরা দেরি না করে অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন। এই স্কলারশিপ আপনার শিক্ষার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে—সুযোগটি হাতছাড়া করবেন না। আপনার ক্যারিয়ারের এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে শুভকামনা রইল।